মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনার মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, রোববার (১ নভেম্বর) প্রণালিতে মাইন বিস্ফোরণের পর দুটি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন ধরে যায়। তবে জাহাজ দুটির পরিচয়, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং হতাহতের বিষয়ে এখনো স্বাধীনভাবে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এর আগে গত শুক্রবার কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) জাহাজ ‘আল মায়েদা’ অজ্ঞাত বস্তু দিয়ে হামলার শিকার হয়। কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি পরিবহন সংস্থা নাকিলাত জানিয়েছে, হামলায় জাহাজের কোনো নাবিক আহত হননি এবং পরিবেশেরও কোনো ক্ষতি হয়নি। ঘটনার পর উপসাগরীয় দেশগুলো এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের মতে, বাণিজ্যিক জাহাজ ও জ্বালানি পরিবহনে হামলা আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি।
এদিকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করতে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দিনের একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে কূটনীতির পথ বেছে নেবে।
তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও ইরানের সঙ্গে সমঝোতা না হলে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান নৌপথ। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল দীর্ঘদিন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজির দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জাহাজের বিমা, পরিবহন ও আমদানি ব্যয়ও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো এই পরিস্থিতির কারণে অর্থনৈতিক চাপে পড়তে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও কূটনৈতিক অগ্রগতির আশায় সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে। তবে নতুন করে ট্যাংকারে হামলা বা সামরিক উত্তেজনা বাড়লে বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ নৌ চলাচল এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার কূটনৈতিক আলোচনা পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আলোচনায় সমঝোতা না হলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
